Share

খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক শহীদুর রহমান খানের পরিবারের ৯ সদস্য ও ৭৩ শিক্ষকের নিয়োগ বাতিলের নির্দেশ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের উপ-সচিব মো. মাহমুদুল আলম স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত নির্দেশনাপত্র ৩ আগস্ট উপাচার্য বরাবর পাঠানো হয়।

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) কর্তৃক গঠিত তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে এ নির্দেশনা দেওয়া হয় বলে মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করে প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর জন্যও বলা হয়েছে। আগামী ১১ সেপ্টেম্বর উপাচার্য হিসেবে শহীদুর রহমানের মেয়াদ শেষ হবে।

বিষয়টি সোমবার (২৯ আগস্ট) নিশ্চিত করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ডা. খন্দকার মাজহারুল আনোয়ার। তিনি বলেন, ২৫ আগস্ট এ চিঠি তারা হাতে পেয়েছেন। যেহেতু চিঠিটি উপাচার্য বরাবর পাঠানো হয়েছে, সেহেতু উপাচার্যের অনুমোদন সাপেক্ষে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা হবে।

তবে ৭৩ শিক্ষকের নিয়োগ বাতিলের নির্দেশের বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় আইন পরিপন্থি বলে মন্তব্য করে এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পূনর্বিবেচনার জন্য আবেদন করা হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এ বিষয়ে কথা বলতে একাধিকবার ফোন করা হলেও রিসিভ করেননি উপাচার্য অধ্যাপক শহীদুর রহমান খান।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের ছেলে, মেয়ে, শ্যালক-শ্যালিকার ছেলে ও ভাতিজাকে নিয়োগ দিয়েছেন। স্ত্রীকেও অধ্যাপক পদে নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তবে প্রক্রিয়া শেষ করার আগেই তা আটকে যায়। সবমিলিয়ে উপাচার্য নিজের পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়দের মধ্যে নয়জনকে নিয়োগ দিয়েছেন। ইউজিসির তদন্তে স্বজনপ্রীতি ছাড়া শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

শিক্ষকদের নিয়োগ বাতিলের বিষয়ে বলা হয়েছে, বিষয় বিশেষজ্ঞ ছাড়া একই ব্যক্তিকে দিয়ে সিলেকশন বোর্ড গঠন করে ২০টি বিষয়ে ৭৩ জন শিক্ষকের নিয়োগ দেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উপাচার্যের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে ২০২০ সালে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের পাঁচজন সদস্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেন। এরপর মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তদন্ত কমিটি গঠন করে ইউজিসি। ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক বিশ্বজিৎ চন্দের নেতৃত্বে গঠিত এ কমিটির অপর সদস্য ছিলেন- খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আফরোজা পারভীন ও ইউজিসির সিনিয়র সহকারী পরিচালক গোলাম দস্তগীর (সদস্য সচিব)। গত ২৩ জানুয়ারি প্রতিবেদন জমা দেয় তদন্ত কমিটি।

তদন্তে উঠে আসে, উপাচার্য নিজের ছেলে শফিউর রহমান খান ও শ্যালক জসীম উদ্দীনকে নিয়োগ দিয়েছেন শাখা কর্মকর্তা পদে। চারজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যারা উপাচার্যের ভাতিজা। তারা হলেন হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা পদে মুরাদ বিল্লাহ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে সুলতান মাহমুদ, ল্যাব টেকনিশিয়ান পদে ইমরান হোসেন ও অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে মিজানুর রহমান। শ্যালিকার ছেলে সায়ফুল্লাহ হককে নিয়োগ দেওয়া হয় সহকারী প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) হিসেবে। ডেটা এন্ট্রি অপারেটর পদে নিয়োগ পাওয়া নিজামউদ্দিন উপাচার্যের আত্মীয়। তাদের সবাইকে অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। উপাচার্যের মেয়ে ইসরাত খানকে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যে প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, সেটি ত্রুটিযুক্ত বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এতে বলা হয়, উপাচার্যের মেয়ে ২০২০ সালের ১৩ এপ্রিল প্রভাষক পদে আবেদন করেন। এ পদে ৩০ জন প্রার্থী আবেদন করেছিলেন, যাদের মধ্যে স্নাতক পর্যায়ের ফলাফলে পিছিয়ে ছিলেন উপাচার্যকন্যা। তার সিজিপিএ ৩ দশমিক ৩০। তদন্ত কমিটি বলেছে, উপাচার্যের মেয়েকে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়ায় স্বজনপ্রীতি ও ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়েছে।

শুধু মেয়েকে নয়, উপাচার্য নিজের স্ত্রীকেও বিশ্ববিদ্যালয়টিতে সরাসরি অধ্যাপক পদে নিয়োগের চেষ্টা করেছিলেন। উপাচার্যের স্ত্রী ফেরদৌসী বেগম উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা। তিনি ২০২০ সালের ১৩ এপ্রিল খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড পাবলিক হেলথ বিভাগের অধ্যাপক পদে আবেদন করেন। তবে এ নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তদন্ত কমিটি বলছে, উপাচার্যের স্ত্রী নিয়োগের শর্তই পূরণ করেন না।

তবে ভিসি’র বিরুদ্ধে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠলেও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। রেজিস্ট্রার নিজেও নিয়োগে স্বজনপ্রীতি করেছেন। তার আত্মীয় ও এলাকাবাসী পরিচয়ে অনেকে চাকরি পেয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন, ভাতিজি জান্নাতুল নাঈম (প্রশাসনিক কর্মকর্তা), চাচাত ভাই কালাম (পরিচ্ছন্নতা কর্মী), দূরসম্পর্কের নাতি কামরুল হাসান (অফিস সহায়ক), চাচাত ভাই আল মামুন (ল্যাব এটেনডেন্ট), নিকটাত্মীয় হান্নান আকন্দ (ফটোকপি মেশিন অপারেটর), নিকট আত্মীয় আবদুল মতিন (কম্পিউটার অপারেটর), এলাকাবাসী জাহাঙ্গীর আলম (অফিস সহায়ক) ও এলাকাবাসী শহিদুল ইসলাম (উন্নয়ন কর্মকর্তা)।

২০১৫ সালের ৫ জুলাই সংসদে খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বিল পাস হয়। এরপর ২০১৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) হিসেবে নিয়োগ পান অধ্যাপক ড. মো. শহীদুর রহমান খান। তিনি ২০১৮ সালের ১১ নভেম্বর রেজিস্ট্রার পদের বিপরীতে অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার হিসেবে ছয় মাসের জন্য অস্থায়ী (অ্যাডহক) ভিত্তিতে নিয়োগ দেন ডা. মো মাজহারুল আনোয়ারকে। ২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষা কার্যক্রমের যাত্রা শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়টি। এখন সেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দুই শতাধিক।

তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৩ জন শিক্ষক, ৩০ জন কর্মকর্তা (স্থায়ী ও অস্থায়ী) এবং ২৩১ জন কর্মচারীসহ (স্থায়ী ও অস্থায়ী) মোট জনবল আছে ৩৩৪ জন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০ জন কর্মকর্তা ও ৪৭ জন কর্মচারী নিয়োগ হয় অস্থায়ী ভিত্তিতে। শুরু থেকে অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন পদে লোক নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *